‘ঈদুল আজহা’ মুসলিম উম্মাহর জীবনে অন্যতম একটি ধর্মীয় উৎসব। আত্মত্যাগ ও মানবতার বার্তা নিয়ে দুয়ারে হাজির হয় প্রতিবছর। জিলহজের দশ তারিখে মহাসমারোহে পালিত হয় বিশ্ব মুসলিমের ঐক্য ও সৌহার্দ্যপূর্ণ এ ইবাদত। ‘কোরবানি’ শব্দের শাব্দিক অর্থ হচ্ছে নৈকট্য অর্জন করা, কারো কাছাকাছি যাওয়া। আর তার পারিভাষিক অর্থ হচ্ছে, নির্দিষ্ট দিনে নির্নিষ্ট পশু আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য জবাই করা।
ঈদুল আজহা বিষয়ে কিছু হাদীস সমূহ:
ঈদুল আজহার দিনে গোসল বিষয়ে- আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত আছে- ‘নবী আলাইহিস সালাম ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহার দিন গোসল করতেন।’ (নাসবুর রায়াহ ১/২১৬)
ঈদের দিন নিজের পোশাকাদির মধ্যে থেকে উত্তম ও সুন্দরটা পরিধান করা সুন্নত। এ ব্যাপারে হাদীস শরীফে বর্ণিত আছে- ‘নবী আলাইহিস সালাম প্রত্যেক ঈদে ডোরাকাটা কাপড় পরিধান করতেন। (সুনানুল বায়হাকী-৬৯৩২)
ঈদুল ফিতরের দিন নামাজের উদ্দেশ্যে ঈদগাহে যাওয়ার আগে কিছু খেয়ে নেওয়া মুস্তাহাব। ঈদুল আজহার দিন এমনটি মুস্তাহাব নয়; বরং কোরবানি হয়ে যাওয়ার পর দিনের প্রথম খাবার হিসেবে কোরবানির গোসত খাওয়া মুস্তাহাব। ঈদের নামাজের আগে কোরবানি করা জায়েজ নয়।
ঈদগাহে যাওয়ার সময় এক রাস্তা এবং ঈদের নামাজ শেষ করে অন্য রাস্তায় ঘরে ফেরা মুস্তাহাব। জাবের ইবনে আব্দুল্লাহ (রা.) বলেন, নবী আলাইহিস সালাম ঈদের দিন (ঈদের থেকে ফেরার পথে) রাস্তা বদল করতেন। (বুখারী: হাদীস নং ৯৮৬)
রাসূলুল্লাহ (সা.) ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহার দিন পায়ে হেঁটে ঈদগাহে যেতেন। তাঁর সামনে একটি বর্শা বহন করে নেওয়া হতো এবং সেটা নামাজের সময় তাঁর সামনে ‘সুতরা’ হিসেবে দাঁড় করিয়ে দেওয়া হতো। (বায়হাকী: হাদীস নং ৬৩৬৪)
অন্য বর্ণনায় আছে, নবী আলাইহিস সালাম ঈদগাহে যেতেন পায়ে হেঁটে, ঈদগাহ থেকে বাড়ি ফিরতেন পায়ে হেঁটে। (প্রাগুক্ত: হাদীস নং-৬৩৬৫)
ঈদগাহে যাওয়ার পথে উঁচু আওয়াজের তাকবীর বলা সুন্নত। নাফে (রা.) বর্ণনা করেছেন যে-
আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) উভয় ঈদের নামাজের জন্য মসজিদ থেকে বের হতেন। ঈদগাহে পৌছা পর্যন্ত (রাস্তায়) তাকবীর বলতেন। ঈদগাহে পৌছেও ইমাম নামাজ আরম্ভ করার আগ পর্যন্ত তিনি তাকবীর বলতেন। (সুনানে দারাকুতনী: হাদীস নং ১৭৩১)
আবু আব্দুর রহমান সুলামী (রা.) থেকে বর্ণিত আছে যে, সাহাবায়ে কেরাম ঈদুল ফিতরের তুলনায় ঈদুল আজহায় অনেক বেশী তাকবীর বলতেন। (হাকেম: হাদীস নং ১১০৭)
এই তাকবীরকে তাকবীরে তাশরীক বলা হয়। তাকবীরটি হচ্ছে- ‘আল্লাহু আকবার আল্লাহ আকবার লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াল্লাহু আকবার আল্লাহু আকবার ওয়ালিল্লাহিল হামদ্।’
বড়রা ঈদগাহে যাওয়ার সময় ছোটদেরকে সঙ্গে নিয়ে যাবে। এটাও একটি মুস্তাহাব আমল। আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর বর্ণিত হাদীসে আছে- রাসূলুল্লাহ (সা.) দুই ঈদের দিন (ঈদগাহের উদ্দেশ্যে) বের হতেন ফযল ইবনে আব্বাস, আব্দুল্লাহ, আব্বাস, আলী, জাফর, হাসান, হোসাইন, উসামা ইবনে যায়েদ, যায়েদ ইবনে হারেসা ও উম্মে আয়মানের ছেলে আয়মানকে সঙ্গে নিয়ে। উঁচু আওয়াজে তাকবীর বলতে বলতে কামারদের রাস্তা ধরে তিনি ঈদগাহে যেতেন এবং নামাজ থেকে ফারেগ হওয়ার পর বাড়ি আসতেন মুচিদের রাস্তা দিয়ে। ( সহীহ ইবনে খুযায়মা: হাদীস নং- ১৪৩১)
ঈদের নামাজ ঈদগাহে আদায় করা সুন্নাতে মুয়াক্বাদা। বুখারীর বর্ণনায় আছে- রাসূলুল্লাহ (সা.) ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহার দিন ঈদগাহে যেতেন।
যদি বৃষ্টিপাত হতে থাকে, অথবা বৃষ্টিপাতের প্রবল সম্ভাবনা থাকে, তাহলে মসজিদে ঈদের নামাজ পড়া জায়েজ। আবু হোরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত হাদীসে আছে- একবার ঈদের দিন বৃষ্টি হচ্ছিল। তখন রাসূলুল্লাহ (সা.) সাহাবীদেরকে নিয়ে মসজিদে ঈদের নামাজ আদায় করেন। (আবু দাউদ: হাদীস নং-১১৬২)
ঈদের দিন হচ্ছে আনন্দ ও খুশির দিন। অনেক সময় খুশিতে মানুষ আখেরাতের ব্যাপারে গাফেল হয়ে যায়। পক্ষান্তরে কবর যিয়ারত করলে আখেরাতের কথা মনে পড়ে। এজন্যে কোনো ব্যক্তি যদি ঈদের দিন কবর যিয়ারত করে, তাহলে বিষয়টি খুবই উত্তম। এতে কোনো অসুবিধা নেই।
কোরবানি:
অনেক আলেমের মতে কোরবানি সুন্নত। তারা নীচের হাদীসটির মাধ্যমে দলিল পেশ করে থাকেন। নবীপত্মী উম্মে সালামা (রা.) বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন-
যখন তোমরা জিলহজ্বের চাঁদ দেখবে এবং তোমাদের কেউ কোরবানি করার ইচ্ছা করবে, তখন সে যেন চুল, নখ ইত্যাদি কাটা বন্ধ রাখে। (মুসলিম: হাদীস নং-৫২৩৪) এই হাদীস ইঙ্গিত করে যে, কোরবানি মানুষের ইচ্চাধীন। ইচ্ছা হলে করবে, না হলে করবে না।
বেশির ভাগ হানাফী আলেমের মতে কোরবানি ওয়াজিব। এই দাবির প্রথম দলিল হচ্ছে পবিত্র কুরআনের আয়াত। আল্লাহ তায়ালা সূরা কাউসারে বলেছেন- ‘আমি তোমাকে কাউসার দান করেছি, সুতরাং তোমরা রবের জন্য নামাজ পড়ো এবং কোরবানি করো।’(সূরা কাউসার: ১,২)
একটি হাদীসে আছে, আবু হোরায়রা (রা.) বর্ণনা করেন- ‘রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, সামর্থ্য থাকার পরও যে ব্যক্তি কোরবানি করবে না, সে যেন আমাদের ঈদগাহের ধারে-কাছেও না আসে।’ (মুসনানে আহমদ: হাদীস নং-৮২৭৩)
কোরবানির দিনগুলোতে যদি কারো কাছে সাড়ে সাত তোলা সোনা, অথবা সাড়ে বায়ান্ন তোলা রুপা, কিংবা সমমূল্যের কোন নগদ অর্থ, বানিজ্যিক পণ্য, অথবা প্রয়োজনের অতিরিক্তি জিনিস পত্র থাকে, তাহলে তার উপর কোরবানি ওয়াজিব হয়। এটাই কোরবানির নেসাব। (বাদায়ে’সানায়ে: ১০/২৫৩) সদকাতুল ফিতর ও জাকাতের নেসাবও একই। অর্থাৎ উল্লেখিত পরিমাণ সম্পদ থাকলে সদকাতুল ফিতর এবং জাকাতও ওয়াজিব হয়। তবে জাকাতের জন্য অতিরিক্ত দুটি শর্ত আছে। প্রথম শর্ত হচ্ছে, সম্পদ বর্ধনশীল হওয়া। আর দ্বিতীয় শর্ত হচ্ছে, সেই সম্পদের ওপর এক বছর অতিবাহিত হওয়া।
সোনা-রুপার সাথে কত টাকা থাকলে মূল্য ধরে নেসাব নির্ণয় করতে হবে? এই প্রশ্নের উত্তরে মুফতী আল্লামা আব্দুস সালাম চাটগামী বলেছেন- নেসাবের চল্লিশ ভাগের এক ভাগ সমমূল্যের অর্থ যদি কারো কাছে থাকে, তাহলে তার সাথে সোনা-রুপার মূল্য ধরে সাড়ে বায়ান্ন তোলা রুপার সমান হয় কি না দেখতে হবে। যদি হয়ে যায়, তাহলে কোরবানি ওয়াজিব হবে। (মাসায়েলে কোরবানি: ৩৬)
ধরে নিলাম, সাড়ে বায়ান্ন তোলা রুপার বর্তমান দাম ৯৫ হাজার টাকা। তা হলে এর চল্লিশ ভাগের এক ভাগ হবে তেইশ শত পঁচাত্তর টাকা। সুতরাং কোরবানির দিনগুলোতে যদি কারো কাছে ২৩৭৫ টাকার সাথে কিছু সোনার অলংকার থাকে, এবং সেটার দাম ৯৫ হাজার টাকা বা তার বেশী হয়, তা হলে তার উপর কোরবানি ওয়াজিব হবে।
মাসয়ালা: কারো কাছে যদি নিত্যপ্রয়োজনের বাইরে অতিরিক্ত আসবাবপত্র, যেমন- ব্যবহারের অধিক থালা-বাসন, খাট-পালং, বিছানাপত্র, বিলাসী কাপড়-চোপড় ইত্যাদি থাকে এবং সেগুলোর মূল্য সাড়ে বায়ান্ন তোলা রুপার সমান অথবা অধিক হয়, তাহলে তার উপর কোরবানি ওয়াজিব হবে। [হেদায়া: (দারুল হাদীস, কায়রো): ১/১৮২]
জিলহজ্বের চাঁদ দেখা যাওয়ার পর কোরবানি করতে ইচ্ছুক ব্যক্তিদের জন্য মাথার চুল, দাড়ি, গোঁফ ও শরীরের অবাঞ্চিত পশম কোরবানির করার আগ পর্যন্ত না কাটা মুস্তাহাব।
কোরবানি আদায় বিশুদ্ধ হওয়ার ৬ টি শর্ত:
যে বা যারা কোরবানি করবে, তাদের কোরবানি আদায় বিশুদ্ধ হওয়ার জন্যও ছয়টি শর্ত রয়েছে। যথা-
১. নিয়ত বিশুদ্ধ হওয়া। একমাত্র আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার উদ্দেশ্যে কোরবানি করা। যদি কেউ অন্যকে দেখানোর উদ্দেশ্যে, কারো সাথে প্রতিযোগিতা করার উদ্দেশ্যে অথবা গোশত খাওয়ার উদ্দেশ্যে কোরবানি করে, তাহলে তার কোরবানি সহীহ হবে না। (প্রাগুক্ত: ১০/২৮১)
২. আল্লাহর সন্তুষ্টি ছাড়া অন্য কোনো নিয়ত আছে, এমন ব্যক্তিকে কোরবানির সঙ্গে শরীক না করা। শরীকানা কোরবানির ক্ষেত্রে কোনো একজনের নিয়ত গলদ থাকলে সবার কোরবানি নষ্ট হয়ে যাবে। (প্রাগুক্ত)
৩. পশু জবাইয়ের সময় কোরবানির নিয়ত করা। (প্রাগুক্ত: ১০/২৮৬)
৪. কোরবানি দাতা ছাড়া অন্য কেউ পশু জবাই করলে কোরবানি দাতার অনুমতি থাকা। স্পষ্ট মৌখিক অনুমতি না থাকলেও কমপক্ষে অনুমতির ইঙ্গিত থাকা। (প্রাগুক্ত: ১০/২৮৭)
৫. কোরবানির পশু শরীয়তে গ্রহণযোগ্য ও দোষমুক্ত হওয়া। সুতরাং শরীয়ত অনুমোদন করে না, অথবা শরীয়তের দৃষ্টিতে দোষযুক্ত পশু কোরবানি করলে সেই কুরবানি সহীহ হবে না। (প্রাগুক্ত: ১০/২৯৫)
৬. কোরবানি দাতা জবাইয়ের সময় নির্দিষ্ট পশুর মালিক হওয়া। কেউ যদি অন্যের পশু কোরবানি নিয়তে জবাই করে এবং সে যদি খুব কাছের মানুষও হয়, তবুও কোরবানি সহীহ হবে না। (প্রাগুক্ত: ১০/৩০০)
একটি হাদীসে আছে, জাবের ইবনে আব্দুল্লাহ (রা.) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন- ‘কোরবানিতে তোমরা শুধু পরিপূর্ণ বয়সের পশু জবাই করো। তবে যদি পূর্ণ বয়সের পশু যোগাড় করতে তোমাদের কষ্ট হয়, তাহলে ছয় মাস বয়সী দুম্বা জবাই করো। (আবু দাউদ: হাদীস নং- ২৭৯৯)
কোরবানির পশু বয়স যেমন হওয়া উপযুক্ত:
হাদীসে ‘মুসিন্নাহ’ বলা হয় ঐ পশুকে, যার দাঁত উঠেছে। ফোকাহায়ে কেরাম কোরবানির পশু উপযুক্ত হওয়ার চন্য বয়সের সীমা বর্ণনা করে দিয়েছেন।
সেই বিবরণ নিম্নরূপ-
(১) ছাগল কমপক্ষে ১বছর
(২) ভেড়া কমপক্ষে ১বছর
(৩) দুম্বা কমপক্ষে ১বছর
(৪) গরু কমপক্ষে ২বছর
(৫) মহিষ কমপক্ষে ২বছর
(৬) উট কমপক্ষে ৫বছর
(আদ-দুররুল মুখতার: ৬/৬৩৫)
কোন রংয়ের পশু দ্বারা কুরবানী করা উত্তম:
যেকোন রংয়ের গবাদিপশু দ্বারা কুরবানী করা জায়েয। তবে সাদা রংয়ের পশু কুরবানী করা উত্তম। রাসূল (ছাঃ) বলেন, দু’টি কালো পশু কুরবানী দেওয়া অপেক্ষা সাদা রংয়ের একটি পশু কুরবানী দেওয়া উত্তম। আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে সরাসরি সাদা রংয়ের বিষয়টি বর্ণিত হয়েছে (বায়হাক্বী হা/১৯০৯০; তালখীছুল হাবীর হা/২৩৮৭; ছহীহাহ হা/১৮৬১-এর আলোচনা)। এজন্য বিদ্বানগণ কুরবানীর পশুর রংয়ের ব্যাপারে বলেন, সর্বোত্তম হ’ল সাদা। এরপর হলুদ/লাল, এরপর মেটে, এরপর সাদা-কালোর মিশ্রণ, এরপর কালো (নববী, আল-মাজমূ‘ ৮/৩৯৬; ইবনু কুদামা, মুগনী ৯/৪৩৯)।
আকীকা:
কোরবানির বড় পশুতে শরীক হয়েও আকীকা করা জায়েয। এক্ষেত্রে আকীকাতে যেখানে একটি ছাগল জবাই করতে হয়, সেখানে গরু, মহিষ ও উটের এক সপ্তমাংশ গ্রহন করতে হবে। কাজেই মেয়ের আকীকায় এক-সপ্তমাংশ এবং ছেলের আকীকায় দুই-সপ্তমাংশ আবশ্যক। শিশুর ভরণপোষণ যার দায়িত্ব, আকীকার যিম্মাও তারই। সুতরাং বাবা আকীকা করে দিবে। বাবার সামর্থ্য না থাকলে দাদা করবে। মায়ের সামর্থ্য থাকলে সেও আকীকা করতে পারবে। এদের কারো সামর্থ্য না থাকলে ঋণ করে আকীকা করার প্রয়োজন নেই। আবার নিজের আকীকা নিজে করতে পারবে। একবার আকীকা হয়ে গেলে দ্বিতীয়বার দেওয়ার দরকার নেই। হাদীস শরীফে একাধিক বার আকীকা করার কথা পাওয়া যায়নি।
তথ্য সূত্র:
(১) ঈদ ও কুরবানি (ইতিহাস, ফাযায়েল, মাসায়েল) -মাওলানা আব্দুল আলীম. (২) কোরবানির তোহফা -মুনশি মুহাম্মদ উবায়দুল্লাহ।-মো: আমানুল্লাহ